প্রেম কী ও কেন

প্রেম শব্দটা বড়ো অদ্ভুত। আদপে বস্তুটিও। অদ্ভুত বলছি, কারণ, এ এমন জিনিস, যার বাস্তবিক ভিত্তি, এই পৃথিবীতে অন্তত, খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আপনার কাউকে দেখে ভালো লাগলে, তা আদপে বিশুদ্ধ যৌন আকর্ষণ। একসাথে কথা বলতে, সময় কাটাতে ভালো লাগছে, ওরে বন্ধুত্ব কয়। পারস্পরিক সহায়তায় দুজনেই একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠছেন, ওটা যৌথযাপন। একটা সময়ের পরে খুব একটা পোষাচ্ছে না একে অন্যকে, তবুও ছেড়ে যাচ্ছেন না, অবাক হবেন না, প্রেম নয়, একে বলে অভ্যেস। আর শেষ বয়সে এসে, যখন আর কোন কিছুই অবশিষ্ট নেই, কিন্তু একজনের জন্য অন্যজন রাত জেগে শুশ্রূষা করছেন, চিন্তায় দৌড়াদৌড়ি করছেন, এ হল মায়া। 

এবার জীবনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষের সাথে এর প্রত্যেকটি অনুভূতিই একাধিকবার অনুভব করেন যেকোন মানুষ। সে সুন্দর, বুদ্ধিমান, সপ্রভিত নারী বা পুরুষের প্রতি আকর্ষণই হোক, বা বাড়ির পোষ্যটির বিদায়কালে চোখ ভাঙা জল। 

তবে প্রেম আসলে কী? এই সবগুলোর মিলিত ফলাফল? নাকি তার থেকেও বেশি কিছু? 

প্রেমের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিক, আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, সময় এবং পরিবর্তনশীলতা। যে কারণে মানুষে মানুষে প্রেম হয়, আর মানুষে বস্তুতে নেশা। তা সে গাঁজা হোক, বা বই। এমনকি নারী বা পুরুষের। কারণ তখন নারী বা পুরুষ তাদের ব্যক্তি পরিচয় ছেড়ে যৌনবস্তু হিসেবে বিবেচিত হয়।

পরিবর্তনশীলতা মানুষের জীবনের অন্যতম প্রধান ধর্ম। আজকের মানুষ, পাঁচবছরের পরে সম্পূর্ণ অন্য মানুষে পরিণত হতে পারে। সেক্ষেত্রে যেকোনো আকর্ষণই, তা একান্তই যৌন হোক, বা সঙ্গলাভ, শূন্য হয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু প্রেমে থাকা মানুষের ক্ষেত্রে তা হয় কী? যদি হয়, তাহলে প্রবল শরীরপ্রেমিক পুরুষ একদা যে তন্বী সুকটি শ্রোণিভারাদলসাগমনার আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, প্রেমের আটবছর বাদে মেদবহুল প্রেয়সীর আলিঙ্গনে সেই একই যৌন আকর্ষণ খুঁজে পান কী করে? বা কোন এক ঝকঝকে চোখের তরুণ, যার গিটার আর তাকে নিয়ে লেখা কবিতা এবং গান শুনে একদা তার সাথে ঘর বাঁধতে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন ব্যাচের সুন্দরী বিদুষীতমা নারী, দশবছর অতিক্রম করে, স্টকের দাম, সেভিংস, মিটিং আর ম্যানেজমেন্ট সর্বস্ব সেই মানুষের মাথায় একই যত্নে যখন হাত বুলিয়ে দেন, কলেজ স্ট্রিট ঘেঁটে কিনে আনেন নতুন বেরনো বই, কেন করেন? কোন প্রাপ্তির আশায়? 

প্রাপ্তিহীন আশা, বলা ভালো আকাঙ্খা, ক্রমশ তার দিকে ছুটে চলা, তাকেই কী প্রেম বলে? 

একইভাবে, সময়। আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে পরিবর্তনশীলতা যেমন মানুষকে ধরে রাখে, সময় মানুষকে শেখায়, কখন প্রেম শেষ হয়ে আসছে। যে মানুষ কোনোদিন ভালোবেসেছিল কাউকে, সময়ের সঙ্গে অবস্থার পরিবর্তনে তার জীবনে সেই মানুষের গুরুত্ব প্রয়োজনের সমানুপাতে কমে এলে, বুঝতে হয়, এবার চলে যাওয়ার সময় এসেছে। প্রেমিকার ভালো চাকরি, সুন্দর ভবিষ্যৎ তাকে বোঝায়, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, রোজগারহীন প্রেমিক, আদপে তার জীবনে অতিরিক্ত একটি অংশ ছাড়া কিছুই নয়। মানবিক কারণে একে অস্বীকার করে এগোতে চাইলে, কেবলই জটিলতা বাড়ে, নয়তো প্রেমিকা প্রেমিককে তার আদর্শ প্রেমিকের জায়গায় "ফিট ইন" করানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে চলে, যা আদপে সম্পর্কের পাশাপাশি দুজন ব্যক্তি মানুষের জন্যেও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে, সময় বোঝায়,  এবার চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। 

এই যে, যা চলে গেলে, আর সবকিছু থাকলেও, অভ্যেস, আকাঙ্খা, এমনকি আকর্ষণও, মানুষ বোঝে এবার চলে যেতে হবে, এই কী প্রেম? 

হয়তো হ্যাঁ। হয়তো না।

Comments

Popular posts from this blog

প্রেমিক, প্রেম ও প্রেমিকারা

মেঘ, বৃষ্টি, রোদ...

ব্যর্থতার কুয়াশা