প্রেমিক, প্রেম ও প্রেমিকারা

 প্রেমিক

"আমাদের প্রত্যেকের কাছে বর্তমান আসলে এক প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা আমাদের অতীতকে অতিক্রম করার।"

কয়েকদিন আগে বলছিলাম নাথকে। এক বছর আগে পিএইচডি করতে হাইডেলবার্গ চলে যাওয়া নাথ। আমার বন্ধু নাথ। কলেজের পাশাপাশি রুমে আমাদের যাপন, যা অতীত বর্তমানে, তা ছিল আমাদের বন্ধুত্বের ভিত্তি। তাহলে আমাদের বন্ধুত্ব আজকে কী? সেই যাপনকে কেবল অতিক্রম করার চেষ্টা? অথচ সম্পর্ক তো তাই। একমাত্র সত্য, এই মুহূর্তটুকু আমাদের। পরের মুহূর্তে আমরা একসাথে থাকতেও পারি, নাও পারি। 

অথচ আমরা প্রাণপণে চেষ্টা করি সেই সত্যটুকুকে আটকে রাখতে। কোনো গভীর অন্ধকারে তাঁকে সরিয়ে রেখে ভবিষ্যৎ জীবনের ব্যর্থ পরিকল্পনা করি। যেভাবে প্রেমিকার স্পর্শবঞ্চিত প্রেমিক নিঃসঙ্গ শয্যায় তার স্বপ্নকে সাজায়।

স্বপ্ন নাকি কল্পনা?  প্রেমিক জানে না। যেমন জানে না, কেউ উঠে চলে গেছে বহু আগেই তার সবটুকু নিয়ে। কেবল উপস্থিতিটুকু ছাড়া। নিয়ম করে, কখনও কখনও কাজের ফাঁকে। অভ্যেস থেকে অবাঞ্চিত সময়ে স্থানান্তরিত হয়েছে সে।  বহু অপেক্ষার পর তিন শব্দে আসা উত্তরে যে কথা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে রোজ। প্রেমিক খেয়াল করেনি। প্রেমিক জানত না, নিশ্চিত জীবন, হাই স্যালারির প্যাকেজ না হলে শুধু ভালোবাসা প্রেম হয়ে ওঠে না।

একটা দৃশ্যকল্প। একজন মানুষের হেঁটে যাওয়া। নুরি সেলানের উজাকের কথা মনে আসে। বরফের রাস্তায় একা হেঁটে যাওয়া ইউসুফ। চাকরিহীন, প্রেমহীন, একা।  উদ্দেশ্যহীন ইউসুফ একা একা ঘুরে বেড়ায়, চাকরি খোঁজে। যেভাবে মানুষ খোঁজে জীবনকে। একজনের থেকে আরেকজনে। ব্যর্থ হয়, একা হয়, আবার খোঁজে। বরফের প্রান্তরে পায়ের ছাপেদের সংখ্যা বাড়ে একে একে। একা ইউসুফের পাশে হাঁটে একা প্রেমিক। পাশাপাশি।

এইভাবে হাঁটতে হাঁটতে একদিন নিজেদের দূরত্ব কমে এলে প্রেমিক একটা ঘরে এসে দাঁড়ায়। একটা ঘর, যার প্রত্যেক দেওয়ালে তার অতীত  লেখা রয়েছে। কালো রঙে তাকে ঢেকে ফেললে, বর্তমান পাশে এসে বসবে একদিন। কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করবে, কি রে, ভালো আছিস?

 

প্রেম

"'ভালোবাসতাম' বলে কোন শব্দ হয় না।" বহুদিন আগে কোথাও একটা লিখেছিলাম। 

কেন লিখেছিলাম, প্রেম? সুনীল তার কবিতায় লিখেছিলেন, "আমার ভালোবাসার জন্ম হয় না, মৃত্যু হয় না।" কোন ভালোবাসারই কী হয়? সম্পর্ক অতীত হয়, মানুষও। ভালোবাসা কি অতীত হতে পারে? মনের গভীরে, কোন এক অবচেতন থেকে তার শেষ চিহ্ন আদৌ কোনদিন মুছে ফেলতে পেরেছে কেউ?

আশ্রয় আর সমপর্ণ, এই দুই শব্দে নিজেকে বুঝিয়েছিলে তুমি। তাই যে তোমার কাছে সমর্পিত করল নিজেকে, তাকে দিয়েছিলে আশ্রয়। আর আশ্রয় হয়ে ওঠা গাছেদের শেকড়ে শেকড়ে জড়িয়ে দিয়েছিলে লতানো গাছের সমর্পণ। কিন্তু যারা দুইই হল, কিন্তু কিছুই পেল না, তাদের তুমি কী দিয়েছিলে, প্রেম?

দাওনি। কারণ তুমি দেখেছ, নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষের থেকে নিজেকে কীভাবে সরিয়ে নেয় পৃথিবী। দেখেছ, ইনবক্সের নীল না হওয়া দাগকে পেরিয়ে কীভাবে অন্য শহরে ঘর বাঁধার গল্প লেখে সে। অন্য কারুর সাথে।  ভালোবাসাকে নতুন করে আবিষ্কার করে তারা। আর নিঃস্ব মানুষ? কল্যাণী স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া ত্রিবেণীর শেষ ম্যাজিক যাকে রেখে গেল একটুকরো দুঃখ নিয়ে? তার কী রইল প্রেম?

নিঃস্ব মানুষদের গল্প থাক বরং। তার চেয়ে এসো, শেষবারের মতো পাশাপাশি বসে দেখি, দূরে কিভাবে মিলিয়ে যাচ্ছে ওরা। জঙ্গলের মধ্যে সেই স্বপ্নের বাড়ির মতো। ভোরবেলা যার রোদ জানলা দিয়ে এসে পড়ত ঘুমন্ত দুজনের শরীরে। সারারাত ভালোবাসাসির পর একে অন্যের সাথে জড়িয়ে থাকা দুজনের শরীর। ক্লান্ত। তৃপ্ত। স্বপ্নের যে বাড়ি থেকে আমাকে ধীরে ধীরে চলে যেতে দেখছ তুমি। 

শেষবারের মতো চলে যাওয়ার আগে একবার বলবে প্রেম, "ভালোবাসতাম"?

একবার?


প্রেমিকারা

"প্রেমিকের কথা বললি, প্রেমের কথাও, আর প্রেমিকারা?"

ইনবক্সে কয়েকদিন আগে পড়ে থাকা মেসেজটা দেখেও কোন উত্তর করিনি। কী বলব? কোন প্রেমিকাদের কথা? যারা ভালোবাসতে চেয়েছিল? না যাদের ভালোবাসতে চেয়েছিলাম?

প্রেমিকারা থাক, আমি বরং একটা গাছের গল্প বলি। এই দুপুরবেলায়, একা বিছানায় রোদ যখন না চাইতেও পাশে এসে বসে, সে সময় পুরনো গাছেদের কথা মনে পড়ে বইকি। ফেলে আসা কোয়ার্টারের সামনের অশ্বথ গাছ। যার ডালে বাসা বেঁধেছিল পাখিরা। যাদের আশ্রয় হয়ে উঠেছিল গাছ। নিজের সবটুকু দিয়ে। তারপর একদিন ঝড় আসে। বুকে আগলে রাখা পাখিদের নিয়ে গোটা রাত কাটানোর পরে, ভোরবেলা পতন হয় গাছের। 

পাখিরা ততোদিনে বড়ো হয়েছে। বাঁচতে শিখেছে নিজেদের ক্ষমতায়। পড়ে থাকা গাছ জানে, এবার তাকে একে একে ছেড়ে চলে যাবে পাখিরা। চলে যাবে অন্য আশ্রয়ে। গাছ আর পাখি একসাথে বুড়ো হবে না কোনদিন। মৃত গাছের শরীরে বেয়ে গজিয়ে উঠবে লতার ঝোপ। রোদ এসে পড়লে, তাদের ভিড়ে কোনদিন হয়তো চোখে পড়বে তার ডালের ভাঙা অংশ। যাতে এখনও ছেড়ে যাওয়া বাসার অবশিষ্ট লেগে রয়েছে।

প্রেমিকারা জানে। তাদের অবচেতনেই তারা ধীরে ধীরে গুটিয়ে নেয় নিজেদের। প্রেমিকের থেকে নিজের গচ্ছিত অংশ ফিরিয়ে নেয় আর কিছু পাওয়ার নেই বলে। তারপর একদিন উড়ে যায় পাখিদের মতো। নতুন পৃথিবীর খোঁজে। আর প্রেমিক জানে, এই স্বাভাবিক। সন্ধ্যে থেকে জ্বলে থাকা বাতিরা যেভাবে ভোর হলে নিভিয়ে নেয় নিজেকে, সেরকমই অন্ধকার কেটে গেলে একদিন নিজেকে সরিয়ে নিতে হয়। প্রেমিকার জীবনের যে অংশটুকুতে জড়িয়ে ছিল সে, সেখানে আজ অন্ধকার কেটে ভোর হয়েছে। সাথে প্রয়োজন ফুরিয়েছে তার। আজ থেকে সে আবার একা, প্রেমহীন।

 প্রেমিকাদের মধ্যে নিজেদের সবটুকু লুকিয়ে রেখেছিল যারা, তারা জানত একদিন সর্বস্বান্ত হবে। তবুও রেখেছিল। যেমন গাছ দিয়েছিল আশ্রয়। হয়তো তাই, আজ তার গায়ে যে বৃষ্টি ঝরে পড়বে, তাতে কোন ক্ষোভ নেই, শুধু অভিমান লেখা আছে। 

সঙ্গমমূহুর্ত থেকে প্রত্যাখাত প্রেমিক, তুমি কি ভেবেছিলে, তোমাকে ভালোবেসে যাবে আজীবন কেউ?









Comments

Popular posts from this blog

মেঘ, বৃষ্টি, রোদ...

ব্যর্থতার কুয়াশা