অমিতাভ, আপনাকে
কোন লেখক মারা যাওয়ার পরে তাকে নিয়ে কোনদিন একটাও শব্দ লিখিনি। শোক এক প্রবল ব্যক্তিগত অনুভূতি, এই বিশ্বাসেই বেঁচে থাকা এখনও। কেবল শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে নিজেকে সামলানো কঠিন হয়েছিল। যে মানুষ আগেরদিন বিকেলেও গল্প করেছেন, পরদিন ভোরে তার নেই হয়ে যাওয়া, এ সামলানো সত্যিই বড়ো কঠিন।
তবে আজকে লিখছি কেন অমিতাভ মৈত্র? লিখছি, কারণ আমার আর আপনার একটা ছোট্ট গল্প আছে। আপনার সাথে কোনদিন দেখা তো দূর, কথাও না হওয়া এক মানুষের। আশ্চর্য, তাই না!
কলেজের থার্ড আর ফোর্থ ইয়ারে আমরা সবাই যখন প্রবল টালমাটালে, কেরিয়ার, প্রেম, লক্ষ্য, জীবনের সবকিছুকেই মনে হচ্ছে হারিয়ে ফেলছি, প্রশ্ন করছি নিজের অস্তিত্বকেই। এই অবস্থা থেকে পালাতে আমরা কেউ খুঁজেছিলাম গান, কেউ বই, কেউ বা সিনেমা। যে যার কমফোর্ট জোনে। আমি এবং আরো কয়েকজন, নিজেদের খুঁজে পাওয়ার আশায় ফিরে এসেছিলাম বইয়ের কাছে। ততোদিনে স্মরণজিতের সুন্দর প্রেমের গল্প অবাস্তব হয়ে গেছে সবার কাছে। হ্যাঁ, ভালো লেখা অজস্র পড়তাম, সাহিত্যমানে তারা অনেক উন্নত, কিন্তু তাতে আমাদের কথা খুঁজে পেতাম না। আমাদের, এই অজস্র শহর, মফস্বলের গলি থেকে বহুতলের ঝলমলে আলোতে বন্দি হয়ে থাকা কিছু মানুষদের অনুভূতি, ভালোলাগা, খারাপলাগার জমানো কথা। কেউ লিখত না তো। পাব কী করে!
তখন বই শেষ হয়ে যাওয়াতে পড়ার নেশায় একা রাতে ছুটে বেড়াতাম অন্তর্জালে। এমনভাবেই একদিন খুঁজে পেলাম বাক। কথোপকথন। আপনি আর অনুপম।
ঢুকতাম না। আপনার নাম শুনিনি কোনদিন। ইন্টারভিউ পড়ব কেন? তার উপর দেখলাম আপনি কবিতা লেখেন। ওখানেই ইতি হয়ে যেত। তারপরেও ক্লিকটা কেন করেছিলাম, সত্যি বলতে আমিও জানি না। আজও।
তারপরে বহুরাত বয়ে গেছে। হোস্টেলে নিজের রুমে বসে থেকেছি বহুরাতে অন্ধকারে, জানলা থেকে ভেসে আসা আলোকে সম্বল করে। আর ল্যাপটপের স্ক্রিনে আপনি। আপনি বলে চলেছেন ছোটবেলার কথা। তিনবছর বয়সে সুখেশ্বর মিস্ত্রির বাড়ির গাছের ডালে গলায় দড়ি দেওয়ার কথা। তার আগের রাতে কান্না শোনা আপনি পরে যার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করবেন, "কাঁদছিলে কেন?" বা অসুস্থ মায়ের অসহায়তায় রেগে গিয়েও তার বেদনার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আবারও জিজ্ঞেস করবেন সেই একই কথা, "কাঁদছিলে কেন?"। আর সেই আপনিই পরে ডুবে যাওয়া ভাইয়ের ফেলে যাওয়া লাট্টু আর ইয়োইয়ো ছুঁয়ে বলে উঠবেন, "কাঁদছিলি তুই? আমি তো কাঁদিনি, দ্যাখ।"
আজ থেকে পঞ্চাশবছর আগের মানুষ হয়েও আপনি কী করে জানলেন অমিতাভ, আমরা কীভাবে কাঁদি? কেন কাঁদি?
তারপরে আপনাকে পড়েছি একে একে। আপনার প্রবল পড়াশোনা, বিবিধ জ্ঞান, প্রজ্ঞা, আপনাকে যারাই পড়েছে, তাদের মুগ্ধ করেছে। আমিও সেই দলে নাম লেখালাম। প্রথমে সাপলুডো, তারপর কাচের ছায়া, তারপর বিশাখা নক্ষত্রের রাত্রি। আপনাকে না পড়লে আমার কোনোদিন ইয়ুং পড়া হতো না, অ্যাডলারও।
"যতদিন আমার হাত,পা,চোখ,এর সাথে সাথে কোনো ঝিঁঝির ডাক,কোনো সাপের নিঃসাড় চলে যাওয়া-এর সবকিছু অক্ষর আর যতিচিহ্ন বলে, বিরাট কোনো উক্তির অংশ বুঝতে না পারব, কিভাবে লিখতে পারব আমি?!
সারাদিন এক ছোট্ট গাছের চারার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থেকে, তার ছোট্ট পাতার শিরায়, নিজেকে আছড়ে ফেলতে না পারি যদি, তার শীর্ণ কান্ডের ভেতর দিয়ে মাটি থেকে উঠে আসা কালের জলের গতি যদি দেখতে না পাই আর দেখাতে না পারি তাহলে আমার লেখা কেন পড়বে তুমি!"
আপনি লিখেছিলেন। আমাদের জেনারেশনের অন্তঃসারশূন্যতা, একাকীত্বকে সঙ্গী করেই হয়তো। নয়তো এভাবে ভেতর পর্যন্ত স্পর্শ করা কী সম্ভব?
অমিতাভ মৈত্র, আপনার থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছরের ছোট এক পঞ্চবিংশতিবর্ষ অতিক্রম করা তরুণ আপনাকে শুধু এইটুকু জানাতে চায়, যে তাদের সময়, জীবনকে শুধু স্মরণজিৎ নয়, আপনিও স্পর্শ করেছিলেন।
আপনার গদ্যসংগ্রহ পড়তে পড়তে বালুরঘাট গেলাম। ফিরে এলাম, বইটা সেখানে থেকে গেল। বইমেলায় আরেকবার কিনলাম, ফিরে এলাম যখন, বই সঙ্গী হল আবার অন্য কারুর। আপনি থেকে গেলেন।
থেকেও যাবেন। সারাজীবন।
Comments
Post a Comment