দশমীর বিকেল আস্তে আস্তে যত গড়িয়ে যায়, বাইরে ধীরে ধীরে কমে আসে গাড়ির শব্দ, কমে আসে উদ্দাম ডিজে আর সম্মিলিত চিৎকার, সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত নামে,  তখন আমার খুব বাড়ির কথা মনে পড়ে। আমাদের বাড়ি। চুঁচুড়ায়। 

বাবার চাকরিসূত্রে আমরা কখনও সান্তালডি, কখনও ত্রিবেণীতে। পুজোয় বাড়ি আসতাম। প্রায় তিনশো কিলোমিটারের যাত্রার শেষটায় আমার আর দিদির ধৈর্য থাকত না। ৭টা ৫৭র ডাউন বর্দ্ধমান লোকালের কামরায় দুই ছোট ভাইবোন এক মনে হিসেব করে চলতাম, আর আটটা স্টেশন, আর সাতটা, আর ছটা, আর...

পাড়ায় দুর্গাপুজো হতো, দুর্গাতলায়। আমরা ক্যাপ ফাটাতাম, প্রোগ্রামের চেয়ার রাখা নিয়ে মারামারি করতাম। বাবুয়াদা পুষ্পাঞ্জলির সময় চেঁচাত, এই কেউ ফুল ছুঁড়বি না, এই ঝুড়িতে ফেল। সকালে গোল করে রাখা চেয়ারে বসত আড্ডা।

আমাদের বাড়িতে দুর্গাপুজো হত না। কালিপুজো। দাদু শাক্ত ছিলেন। নিজেই পুজো করতেন। সারারাত ধরে পুজো চলত। বাবা জেঠুরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন, কিন্তু ওইটুকুই। বাকি সমস্ত কাজ নিজের হাতে। ভোর সাড়ে চারটেয় পুজো থেকে উঠে আস্তে আস্তে পেছনের দরজা দিয়ে ঘরে ফিরে যেতেন দাদু। প্রতিবার দেখেছি, সারারাত জেগে থাকা মুখে ক্লান্তির পাশপাশি এক অদ্ভুত তৃপ্তি খেলা করছে।

বিসর্জনে যেতেন না দাদু। গঙ্গার ঘাটে বাবা আর জেঠু মিলে ধরাধরি করে প্রতিমা নামাতেন। সেই ভেসে যাওয়া প্রতিমার শেষটুকু যতক্ষণ দেখা যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতাম ঘাটের সিঁড়িতে। গঙ্গাবক্ষ অন্ধকারে আস্তে আস্তে টেনে নিত প্রতিমাকে চোখের আড়ালে। বাড়িতে ফিরে দেখতাম, অন্ধকার ঘরে দাদু বসে আছেন চুপচাপ। শূন্যদৃষ্টি। অন্ধকারেই দেখতাম, দাদু কাঁদছেন। নিঃশব্দে।

ত্রিবেণীর ঘাটে দাদুর অস্থি যখন মিশে যাচ্ছে গঙ্গায়, আমি সেই একই দৃষ্টি দেখেছিলাম বাবার চোখে। 

দাদু মারা যাওয়ার পর আস্তে আস্তে ধুলো জমল দাদুর ঘরে। ধুলো জমল আলমারিতে থাকা রবীন্দ্র, শরৎ, মানিকের গায়ে। বছরে পুজোর সময় চারদিন বাড়িতে গেলে লোক ডেকে পরিস্কার করাতেন বাবা। ঠাকুমা মারা গেলেন যে বছর, সে বছর বাড়িও গেলাম না আমরা। দাদুর ঘরে পুরনো ধুলো জমল আরেকটু, অন্ধকার বাড়ি চারদিনের আলোর উৎসব না কাটিয়েই একবছরের জন্য অন্ধকারে ডুবে গেল আবার।

পাড়ার চেয়ার, যেখানে আড্ডা জমাতাম সবাই একসাথে, তারা ফাঁকা হল ক্রমশ। চাকরি, বান্ধবী, পড়াশোনা, একে একে উঠে গেল পাশ থেকে। ফাঁকা চেয়ারগুলো নিয়ে গেল অন্যরা। মন্ডপের মূর্তির দিকে মুখ করে বসে রইলাম কেবল আমি। বছরের চারটে দিন। একা।

কল্যাণীতে বসে এবছর দশমীর রাতে যখন লিখছি, তখন দাদুর ঘর বন্ধ অবস্থায় পেরিয়েছে আরো একটা পুজো। বাকি চেয়ারগুলোর পাশাপাশি এবার শেষ চেয়ারটাও ফাঁকা পড়ে থাকায় নিয়ে চলে গেছে কেউ। 

"সবাই একে একে চলে যাচ্ছে মা।

তুই অন্তত পরের বছরটা আসিস।"

Comments

Popular posts from this blog

প্রেমিক, প্রেম ও প্রেমিকারা

মেঘ, বৃষ্টি, রোদ...

ব্যর্থতার কুয়াশা