মধ্যরাতের অর্ধপ্রলাপ পঞ্চম অধ্যায়
প্রিয়
তোমার গল্প কিকরে লিখি বল তো?
বাকি গল্পগুলো আমি সহজেই লিখে ফেলি। কারণ সেগুলোতো আমারও গল্প, আমাদের গল্প। সেগুলো তো আমি জানি।
কিন্তু এই গল্প শুধু তোমার। এখানে আমি নেই। তাহলে লিখব কি করে?
আচ্ছা আমাদের প্রথম দেখা দিয়ে শুরু করি?
তোমাকে আইসারে প্রথম কবে দেখেছিলাম? মনে নেই। মনে থাকবে কি করে? যে গল্প নিখুঁত গদ্য হতে পারত,তাতে এলোমেলো কবিতা আশ্রয় নিলে কি তার আর শুরু শেষ থাকে? ঘটনাপ্রবাহে ভালোবাসার যাপন শুরু হলে কবিতার বইই তার একমাত্র ঠিকানা। নোংরা, হলদে হয়ে আসা, মলাটবিহীন পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে হঠাৎ খুঁজে পাওয়া। কবিতার বই।
সেই বইয়ের মাঝখান থেকে কিছু লাইন তুলে নিলে দেখতে পাই,
তুমি এসে দাঁড়িয়েছ ক্যান্টিনের সামনে। হাওয়ায় উড়ছে তোমার চুল, বিকেলের টুকরো কিছু আলো ব্যর্থ চেষ্টা করছে সেখানে বাসা বাঁধার। বন্ধুদের সাথে হাসি শব্দে মুখরিত তুমি।চারপাশের ব্যস্ততা স্পর্শ করছিল তোমাকে, আর আমাকে তুমি। তোমার অজান্তে চারপাশকে অতিক্রম করে ঘুরতে ঘুরতে আমার মধ্যে ঢুকে পরছিল তারা।
সেদিন তোমার হাসি আমার মুগ্ধতাকে সঙ্গী করে ছড়িয়ে পড়েছিল ক্যান্টিনের প্রত্যেকটা কোণে। খাওয়া শেষে ঘরে ফিরে গিয়েছিলে তুমি। ঘরে ফিরেছিলাম আমি। একা।
আর বাকি আইসার দেখেছিল কি এক অস্বাভাবিক উজ্জ্বলতায় ঢাকা রয়েছে পুরো ক্যান্টিন।
পাতা উলটে গেলে কোনো এক সাধারণ পংক্তিতে চোখ আটকে যায়।
হাত বাড়িয়ে রয়েছ তুমি। মেঘলা বিকেলের আইসার। ঘুরতে বেরিয়ে পিছিয়ে পড়া বন্ধুর দিকে এগিয়ে দিচ্ছ তোমার হাত।
হাতে হাত মিলছে, বন্ধুত্ব মিশে যাচ্ছে প্রথম কালবৈশাখীর ধুলোয়। বৃষ্টি শুরু হতে অর্ধেক তৈরি হওয়া গার্ডেন হাইয়ের আশ্রয়ে তোমরা। রোবাবার বিকেলের ঘরফেরতা আমিও। বাইরে ধূসর চাদর তৈরি হচ্ছে।হঠাৎই বেরিয়ে গেলে তুমি। প্রবল বর্ষণ থেকে কিছু জলকণা্কে আশ্রয় দিয়ে ফিরলে যখন , আমি দেখলাম কিভাবে বৃষ্টির ফোঁটায় ধরা রয়েছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মুহূর্তরা।
বৃষ্টি কমে এল। ঝিরঝির। বন্ধুদের সাথে হোস্টেলের পথে পা বাড়ালে তুমি। পা বাড়ালাম আমিও। আবার। সিক্ত আর শুস্কের তফাৎ বুঝে গিয়েছি ততদিনে। তাই আবারো, একাই।
তারপর থেকে মাঝরাতে বৃষ্টি এলেই আইসার একটা ছেলেকে একা একা ভিজতে দেখে।
বইয়ের এক বিখ্যাত কবিতায় এসে থমকে দাঁড়াই।
কলেজ ফেস্ট। চারপাশের চরম ব্যস্ততা, তোমাকে ঘিরে রাখে সবসময়ের জন্য। ঘরে বসে সমালোচনায় ব্যস্ত আমরা। নাম উঠে আসে তোমার। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসি।
আমাদের স্বপ্ন সাজানো ব্যক্তিস্বার্থের বোড়ে দিয়ে। তাতে জীবন নামক রানীর প্রবেশ ঘটলে আমরা নিতে পারি না। চেষ্টা করি তাকে বোর্ড থেকে বার করে দিতে।
তাও একদিন ফেরার রাস্তায় তোমার সঙ্গী হই। জোর করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ল্যাম্পপোস্টের আলো নিয়ে এগিয়ে যাও তুমি। পিঠে স্বপ্নের ব্যাগ নিয়ে পিছিয়ে পড়ি আমি। পিছোতেই থাকি। একসময় মিশে যাই আলোর পেছনের অন্ধকারে। একা।
বহুদিন পরে আবার সেদিন আইসারে প্রত্যেক ল্যাম্পপোস্টের মাথায় বেলুন উড়েছিল।
বই বন্ধ করার আগে শেষ কবিতায় চোখ পড়ে যায় একবার।
উৎকল দিবসে শাড়ি পরে এসেছ। অদ্ভুত মুগ্ধতায় ডুবে গেছি আমি। আচ্ছা সব মুগ্ধতা কি অদ্ভুত হয়? আমার প্রশ্নে অবাক চোখে তাকিয়ে থাক তুমি।
সেই মুগ্ধতা আমার চোখ থেকে ছড়ায় বাকিদের চোখে। ছড়ায় সমগ্র ঘরে। সেখান থেকে কলেজে ,জেলায়, রাজ্যে, দেশে, পৃথিবীতে। আমি অপেক্ষা করি।
একদিন রাস্তা শেষ হয়ে আসে। তোমার চোখে তখনো শুধুই বিস্ময়। আমি বুঝি, জীবনের এই এপিটাফেও আমি সেই একই। আগের মতো। একা।
প্রশ্নরা থাক তাদের মতো। তার থেকে দেখ, সিঁড়িতে তোমার একলা রাখা অবহেলার পাশে এসে বসছে আমার একাকিত্বের অভিমান। ওদের মাঝে তৈরি হওয়া গলি, যাতে এতদিন ছড়িয়ে ছিল আমার ব্যর্থতারা, আজ তাদের একদিকে জড়ো করে রাখছে সময়।
দূরে কেউ অপেক্ষা করে রয়েছে। আলাদা হচ্ছি আমরা, সেখান থেকে জন্ম নিচ্ছে ভবিষ্যৎ। যার গর্ভে ক্রমশ একা হয়ে যাওয়া আমরা হয়ত আবার কখনও পাশাপাশি এসে বসব। সেখানে আইসার থাকবে না। অতীত থাকবে না। ভালোবাসাও না।
সেদিন ভেঙে পড়া আকাশে একসাথে দুটো ছেলেমেয়ে ভিজবে।

Comments
Post a Comment