মধ্যরাতের অর্ধপ্রলাপ তৃতীয় অধ্যায়
অনেকদিন আগে এক অন্ধকার গিলে নিয়েছিল আমায়।
নিস্পন্দ, কালো , শীতল, এক অন্ধকার।
আমি থাকতে চাইনি সেখানে। তাই দৌড়োতাম। তার মধ্যেই। প্রতিদিন। প্রতিমুহূর্তে। আর সার্কুলার ট্র্যাকের মতো সব ফিনিশিং লাইনগুলো আবার স্টার্টিং লাইন হয়ে যেত। আমি তাও দৌড়োতাম। বেরিয়ে আসার জন্য। সবাই যেমন দৌড়োয়।অন্ধকার নামক আমিটার থেকে পালানোর জন্য।
কিন্তু এইভাবে নিরন্তর দৌড়োতে দৌড়োতে আমরাও মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ি। কোনো একটুকরো আলোর সামনে। এক ছোট্ট ফাটল থেকে চুঁইয়ে পড়া সামান্য, নিস্তেজ, টিমটিমে আলো। কোনোরকমে নিজের অস্তিত্ব ধরে রেখেছে যে। কিন্তু আমাদের অন্ধকার থেকে পালানোর সুড়ঙ্গের একমাত্র আলো সেই। টানেলের গভীরে হারিয়ে যাওয়া রেললাইনের শেষ ফেলে আসা স্টেশন। খুঁজে পেলে প্রায় নিভে যাওয়া আলোতেও যার নামটা পড়ে নেওয়া যায়।
"চন্দননগর" ।
কোনো এক শীতের সকালে আমি যেখানে নেমেছিলাম।
রোববারের সকালের অলসতার জন্য আমার দৌড়ও আমায় বাঁচায়নি। তন্ময় স্যারের রাগী মুখ আমাকে দরজায় আটকে দিয়েছিলো।আমিও সেটাকে পাকা ফরোয়ার্ডের মতো ড্রিবল করে ঢুকে পড়েছিলাম ঘরে। কিন্তু, তৃতীয় বেঞ্চের কর্নারের সিটটা আটকে দিয়েছিলো আমায়।
অনেকদিন বাদে রঙীন কিছু দেখছিলাম আমি।
একটা কালো কুর্তি আমাকে প্রায় দেড়বছর বাদে ধূসরতার বাইরের পৃথিবীতে নিয়ে আসছিলো।
ধীরে ধীরে অন্ধকার মফস্সলের জায়গা নিচ্ছিল আলোকিত শহর। ফিরছিলো অন্যান্য রঙেরা। বহুদিনের ঘুমের ভেতর থেকে স্বপ্নেরা জেগে উঠছিলো । বড়ো হয়ে ওঠা দিন জানিয়ে দিচ্ছিল শীতের বিদায়বার্তা।
আর,বহুবছর বাদে......
সদ্য গজানো পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া লালচে বিকেলের আলোয় শহরে ছড়িয়ে পড়েছিলো বসন্ত। যেখানে ততদিনে গলাব্যথা উপেক্ষা করে ভালোবাসা আদায় করে নিয়েছে শীতের আইসক্রিম। তার্কিক ঠোঁট বন্ধ হয়ে গিয়েছে স্ট্যান্ডের ফুচকার ভালোবাসায়। আলমারি থেকে পড়ার বইয়ের ফাঁকে কুন্দেরা, মার্কেস সরে গিয়ে ফিরে আসছেন স্মরণজিৎ, সুদীপ নাগারকাররা। আর হেরে যাওয়া এক রাখালবালকের বন্ধু হচ্ছে এক রাজকন্যা। শেষ গোধূলির রাজকন্যা।
কিন্তু...
সব গল্প তো মেলে না।এটাও মেলেনি।
আসলে মেলাতে না পারাটা আমার ছোটবয়সের অভ্যাস। তা সে, পরীক্ষার খাতার উপপাদ্যই হোক, আর অঙ্কের খাতার শেষ পাতায় লেখা কবিতা। মাঝপথে এসে হারিয়ে যেতাম। একইভাবে, এটাও পারিনি। শহরময় ভেসে বেড়ান বুদ্বুদে ছড়িয়ে পড়ত ভালবাসার রঙ। আর আমি শুধু দেখতাম। স্পর্শ করতাম না। যদি ভেঙে যায়!
আস্তে আস্তে বসন্ত শেষ হয়ে আসে। বিকেলের লালচে রঙ মুছে গিয়ে রোদ ছড়ায় পুরনো শহরের বুকে। একা পড়ে থাকে ফোন। প্রতিদিনের বাক্যালাপ পরিবর্তিত হয় সপ্তাহে, মাসে। শুধু থেকে যায় শহরজুড়ে উড়ে বেড়ান বুদ্বুদগুলো।
বিশ্বাসের বুদ্বুদ।

Comments
Post a Comment