মধ্যরাতের অর্ধপ্রলাপ ২য় অধ্যায়
আজ থেকে অনেকদিন আগে কোন এক ছোট মফস্বলে এক ভিখিরি থাকত। অদ্ভুত এক ভিখিরি সে। কোনোদিন তাকে ভিক্ষে চাইতে দেখিনি। ভিক্ষে না চেয়ে কি ভিখিরি হওয়া যায়! সেও তাই চাইত। কিন্তু টাকা-পয়সা বা খাবার নয়। সে চাইত কিছুটা পেঁজা তুলোর মত সাদা বরফ। মাঝ দুপুরে বা রাতের অন্ধকারে আকাশ থেকে ঝরে পড়া বরফ।
লোকে পাগল বলত। কিন্তু ভিখিরিটা আর কোন পাগলামি করত না। কেবল বসে থাকত আর লোক দেখলেই এক জিনিস চাইত ।
আর ছিল আর এক ছেলে। বড্ড ছেলেমানুষ। মাধ্যমিক পাশ করা সত্তেও যে চুল আঁচড়াতে কেবলি ভুলে যায় , দিনের পর দিন এক জামায় চালিয়ে দেয়। মেয়ে দেখলে মাথা নামিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটে। আর বইএর মধ্যে মুখ গুঁজে দিন কাটায়।
একদিন ছেলেটা ভিখিরিকে গিয়ে প্রশ্ন করে। সে এড়িয়ে যায়। ছেলেটা ছাড়ে না। তারপর অনেকদিন বাদে ভিখিরি আস্তে আস্তে বলে তার কথা। বলে ওই তুষারপাত নাকি একজনের জীবনে সবথেকে দরকার। তার জীবনেও একদিন হয়েছিল। কিন্তু সব বরফই তার হাতের ফাঁক দিয়ে গলে পড়ে গেছে। তাই আজও সে সেই বরফগুলো খুঁজে বেড়ায়।
এমন হয় নাকি ? ছেলেটার মনের এই প্রশ্নের উত্তরে ভিখিরি হেসেছিল। বলেছিল ‘হয় না। কিন্তু হয়’। কাফকা, নীত্শে, ফুকো, দেরিদার মতে না হলেও, হয়। ছেলেটা বুঝতে পারেনি। ভেবেছিল ওই লোকগুলোর কাছ থেকে হয়ত জানা যাবে।
ওদের বই পড়তে শুরু করল ছেলেটা।কিন্তু কোথায় কি? ছেলেটা কিছুই পেল না। তারপর একদিন আস্তে আস্তে ভুলে গেল সেই কথা।
তারপর একদিন সত্যি সত্যি রিক্রিয়েশন ক্লাবের কাছের রাস্তায় নেমে এল সেই তুষার। ছেলেটা দেখল গ্রীষ্মের মাঝ দুপুরের রোদ , বরষার অন্ধকার রাত্রের বৃষ্টি বা শীতের ভোরবেলার কুয়াশার মধ্যেও যা ঝরে পড়ে। ছেলেটা ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রত্যেকটা টুকরোই পড়ে যায়। প্রায় দেড় বছর ধরে চলা সেই তুষারপাতের শেষে সে হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করে তার সংগ্রহে বরফের সংখ্যা...শূন্য। ঠিক সেই ভিখিরির মত।
সময়ের সাথে গদ্যের মত বয়সের সাথে সাথে জীবনেরও বিনির্মাণ ঘটে। পুরনো ভাষার জায়গা দখল করে নতুন। রাত্রের অন্ধকারের জায়গা নেয় ল্যাম্পপোস্টের আলো। বৃষ্টির জল শরীরের বদলে সংগ্রহ করে বর্ষাতি। আর শীতের ভোর হারিয়ে যায় কম্বলের উষ্ণতায়।
কিন্তু তারপরেও কলামের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়া হেক্সেনের গন্ধ থেকে মেন্টরের কাছে ঝাড় খাওয়া বাদ দিলে যেটা পড়ে থাকে সেটা হলো একটুকরো ভালোলাগা। মাঝরাতে আচমকা ঘুম ভেঙে গেলে নিজেকে বড্ড একা মনে হওয়ার পরে যে জিনিসটা পরেরদিন আবার বাঁচতে শেখায় সেটাও পড়ে থাকে। তার নাম বিশ্বাস।
সেই দুটোকেই সম্বল করে ছেলেটা একদিন দুরদেশে পাড়ি জমায় বরফের টুকরোর সন্ধানে। এক লবনাক্ত হ্রদের দেশে। অনেক খোঁজার পরে সে খুঁজে পায় সেই বরফের স্তুপ। কিন্তু সেখানে পড়ে থাকা এক আয়না তাকে এগোতে দেয় না। হাজার অনুরোধ সত্ত্বেও সরে না সে।আর সেই আয়নার কোলে শুয়ে থাকা বরফে প্রতফলিত হয় আলো। জীবনের আলো।
অনেক অনুনয় বিনয়ের পড়ে ধৈর্যচ্যুত হয়ে পড়ে ছেলেটা এবার সজোরে ঘুসি মারে আয়নাটায়। ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে খসে পড়ে আয়নাটা। কয়েকটা টুকরো ছেলেটার হাতে ঢুকে যায়। বেরিয়ে আসে রক্ত। ছেলেটা খেয়ালও করে না। পাগলের মত বরফের টুকরো খুঁজতে থাকে। কিন্তু পায় না। হাতে যা উঠে আসে তা সবই কাঁচ। বা হয়ত বরফ। মিশে গেছে তারা। জীবনের আলো ভালোবাসার প্রতিসরাঙ্কে চিরকালের মত মিলিয়ে দিয়ে গেছে তাদের।
ব্যর্থ হয়ে ছেলেটা ফিরে আসে। আস্তে আস্তে আবার হতাশ জীবনের ভিড়ে মিশে যায়। হারিয়ে যায় ভিখিরি , হারিয়ে যায় তুষারপাত। শুধু জীবনের বাঁকের মুখে আটকে থাকে একটুকরো কাঁচ।
একটুকরো রক্তমাখা লালাভ কাঁচ।

Comments
Post a Comment