মধ্যরাতের অর্ধপ্রলাপ চতুর্থ অধ্যায়
-“হ্যাঁ বসুন। এই তো, আস্তে আস্তে, হ্যাঁ ঠিক আছে। যাক।”
আমি ঘোলাটে চোখে তাকালাম। সামনে ক্রমশ আবছা হয়ে আসা একটি মেয়ের অবয়ব।
-“শুনতে পাচ্ছেন তো?" বহুদুর থেকে এক কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। আমি ঘাড় নাড়ি।
-“এত মদ খান কেন?”
আমি হেসে উঠি। যদিও বারের দেওয়ালগুলো ছাড়া আর কেউই শুনতে পায় না।ওরা জানে, মদ আর আমি খাই না। খেতাম। পাস্ট টেন্স। মদ এখন আমায় খায়।
-“হ্যাঁ, আপনি যেটা বলছিলেন। বর্তমান পৃথিবীতে নারীমুক্তির ভবিষ্যৎ আসলে দাঁড়িয়ে রয়েছে...”
-“বালের উপর।”
-“অ্যাঁ?”
আমি রিপিট করি। সশব্দে। সামনের কয়েকটা লোক ঘুরে তাকায়। চাপা গলায় মন্তব্য উড়ে আসে, মাতাল শালা।
আমি বলতে থাকি। “ জীবনে কখনও ধর্ষণ দেখেছেন?”
-“না মানে...”
-“দেখেননি। আমি দেখেছি। প্রতি রাতে। প্রতি দিনে। প্রতিটা ঘণ্টায়। প্রতিটা সেকেন্ডে।
আপনি দেখেননি, পড়েছেন। জেনেছেন। কভার স্টোরি করেছেন। ফেমিনিজম নিয়ে পাতার পর পাতা লেকচার দিয়ে গেছেন। উলটোটা ভেবেছেন? মানে ভাবার চেষ্টা করেছেন কখনো ?
আপনার দিকে দশ সেকেন্ড আমি তাকিয়ে থাকলে আমি চরিত্রহীন। বাসে ধাক্কাধাক্কির মধ্যে আমার শরীর আপনাকে স্পর্শ করলে আমি ধর্ষক। আপনাকে একবারের জায়গায় দুবার মেসেজ করলে আমি খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে আছি।
আর উল্টোগুলো? মানে যদি আমার জায়গায় আপনি থাকেন? হে হে, সেক্ষেত্রেও সেই চরিত্রহীন ধর্ষক কিন্তু আমিই। কি মজার ব্যাপার বলুন দেখি?”
- “না মানে, এগুলো তো বহু পুরনো কথা। সাইড এফেক্ট। হ্যাঁ, কিছু পুরুষ ক্ষতিগ্রস্থ। কো-ল্যাটেরাল ড্যামেজ। সেটা নিয়ে তো আর...”
- “কি সুন্দর কথাটা না? কো-ল্যাটেরাল ড্যামেজ। আহা। মাইনরিটির ক্ষতি ও মেজরিটির লাভ। গণতন্ত্র। কিন্তু ম্যাডাম, গণতন্ত্রের যে বাকি কথাটা? মেজরিটির সিদ্ধান্তের পাশাপাশি মাইনরিটির প্রশ্নের সম্মান? নাকি সেটাও আজকাল ওই ‘অশ্বথামা গজ”?
আরে আরে, উঠছেন কেন? সত্যি কথা শুনে রাগ হয়ে গেল? কি করব বলুন। লেডিস সিটে বসে থাকা সুবেশা তরুণীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধকে দেখে আমারও অমনি রাগ হত। কিন্তু ওই যে, মেজরিটি। কন্ট্রোল করে ফেললাম।”
-“আপনি আজ প্রকৃতস্থ নন। পরে একদিন ইন্টারভিউ নেওয়া যাবে। আমি আজ...”
-‘বসুন।” শরীরের শেষ শক্তিটুকু প্রয়োগ করে সামনের উঠতে চাওয়া মানুষকে ফিরিয়ে আনি চেয়ারে। “আপনারা সাবঅল্টারনের উদাহরণ টেনে ওবেরয়ে লেডিস ফার্স্ট দেখাবেন। ঘরে বসে কেরানির জব থেকে পাওয়া পিরিয়ডকালীন ছুটিতে কাজের মহিলাকে শাসন করবেন কেন আগের সপ্তাহে সে কামাই করেছে। কারুর মিথ্যে অপবাদের জন্য কেউ সুইসাইড করবে, আপনারা নির্ভয়া বলবেন। কাউকে খুন করা হবে, কারুর যৌনাঙ্গ কেটে নেওয়া হবে, কাউকে বেঁধে পাশের রুমে সঙ্গমে লিপ্ত হবে স্ত্রী, আপনারা নির্ভয়া বলবেন। ঠিক যেমন ‘পার্কস্ট্রীট’-এর ‘বানতলা’। এবিপি আনন্দে শিক্ষক(!)এর বারংবার আওড়ে যাওয়া ’৩৪ বছর’। আপনারা, আপনারা......”
ঠিক সেই মুহূর্তে মৃত্যু হয় আমার। টেবিলের উপরে উঠে থাকা হাত ঝুলে পড়ে একপাশে।
মৃত্যুকালীন পৃথিবীতে আমি বিড়বিড় করতে থাকি, “ আমি পিএনপিসি করতে পারতাম না, আমার দোষ!আমি পড়া কামাই করে তোমার টিউশনের সামনে ডিউটি দিতে পারতাম না, আমার দোষ। আমার বাবা আমাকে মোবাইল কিনে দেয়নি, তোমার জমজ বোন আমাকে সহ্য করতে পারত না, সব দোষ আমারই। কিন্তু বিশ্বাস কর অঙ্কিতা......”
না থাক। কোন বিশ্বাসেরই আর প্রয়োজন নেই আজ। এই পৃথিবীতে বিশ্বাসের দরকার ফুরিয়েছে।
বহুদিন আগে বালিয়াড়িতে আমরা এক ঘর বানিয়েছিলাম। থাকব বলে। সময়ের স্রোত এসে ভেঙে দিয়ে যাওয়ার পর সেখানে শুধুই কাঁচ। হাঁটতে ভয় পাই। যদি পা কেটে যায়!
তবু প্রয়োজনে বিশ্বাস করতে হয়। ভয় পাই। হারানোর নয়। নতুন কিছু পাওয়ার। পেলে যদি আবার হারাতে হয়?
স্মৃতি পুরো লুপ্ত হওয়ার আগে বুঝতে পারি আমাকে তুলে ধরছে কয়েকজন। জানি এরপর কেউ পৌঁছে দেবে আমায়। আমার ঘরে। ঠাণ্ডা, নিশ্চুপ, একা একটা ঘর। আমি গেলেও একলা থাকে যে। না, সেই ঘরে কোন কাঁচ নেই।
মা,মা , আরেকবার দরজাটা খোল। বিশ্বাস কর, আমি যৌনতাকে বিক্রিই করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কেউ মন দাম হিসেবে দিতে রাজি হয়নি।

Comments
Post a Comment