শেলি, পো, জীবনানন্দ, এবং...
পোএর সঙ্গে আমার পরিচয় কিশোর বয়সে। তার ছোটগল্পের মধ্যে দিয়ে। বাংলা অনুবাদে। কি কারণ ছিল জানি না, তবে নাইনে পড়া এক বালকের তার ফ্যানবয় হতে বেশি দেরি হয়নি।
পরে বড় হয়ে যখন পো সম্বন্ধে পড়েছি, তখন জেনেছি, তিনি আমেরিকার ছোটগল্পের জনক। শুধু তাই নয়, পরবর্তীকালে মেরি শেলির পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্যে গথিক ফিকশনের জন্মও দিয়েছেন তিনি।
কিন্তু এই দুইয়ের বাইরেও যে একজন এডগার অ্যালান পো থেকে গিয়েছেন, সেটা আমি কয়েকবছর আগে পর্যন্ত জানতাম না। এবং সত্যি বলতে, কবিতা নিয়ে খোঁচাখুঁচি করতে গিয়ে The Poetic Principle হাতে না এলে জানতেও পারতাম না, আমেরিকান কবিদের অন্যতম একজনকে আমি কেবল ছোটগল্প লেখক বলেই জেনে এসেছি এতোদিন।
ইংরেজি কবিতার সাথে আমার পরিচয় টেক্সট বইয়ের বাইরে হয়েছিল কোলরিজের কুবলাই খাঁ দিয়ে। পরে অবশ্য বুঝেছিলাম, ব্যাপারটা বৃহৎ স্তরের পেছনপাকামো হয়েছিল। তবে অদ্ভুতভাবে, কোলরিজ, শেলি ও কীটস যেভাবে আমাকে আকৃষ্ট করেছে, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, বায়রন, টেনিসন সেভাবে করেনি কোনদিনই। কেন জানি না।
এদের মধ্যে কোনকারণে শেলির কবিতা অদ্ভুতভাবে সাথে থেকে গেল। খুঁজে খুঁজে পড়ে ফেললাম বেশ কিছু। তখন ঘরে কম্পিউটার ছিল না, ইন্টারনেট তো দূরস্ত। স্মার্টফোনের জমানা তখনও বেশ খানিকটা দূর।
স্কুলের কোন একজন স্যার, আজ আর তার নাম মনে নেই, আমাকে বেশ কিছু বই পড়তে দিয়েছিলেন। ইংরেজি কবিতার। তাতে খুঁজে পেয়েছিলাম শেলির, "To a skylark". স্ত্রী মেরি শেলির সঙ্গে হাঁটতে বেরিয়ে স্কাইলার্কের গান শুনে লিখে ফেলা, "The world should listen then, as I am listening now."
ততদিনে ওয়ার্ডসওয়ার্থের To the skylark পড়ে ফেলেছি। পরের কয়েকদিনের মধ্যে পড়ে ফেলব কীটসের Ode to a nightingale. ওয়ার্ডসওয়ার্থের "ethereal minstrel" থেকে শেলির "blithe Spirit" তে স্কাইলার্কের কিভাবে বিবর্তন, সেই নিয়ে ক্লাসের বন্ধুদের সামনে আঁতলামো মারছি। আঁতলামোই, কারণ তখনও বোঝার মতো জ্ঞানবুদ্ধি কোনটাই আমার মনে হয়নি। পরে যখন নারায়ণ সান্যালের প্যারাবোলা স্যারে এই দুইয়ের মধ্যে তুলনা (আমার কাছে এই টপিকে বেস্ট অ্যানালিসিস) পড়েছি, তখন সেই ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছে।
পো এর কবিতা যখন পড়লাম, ততদিনে শেলি বা কীটসের কবিতার সাথে আমার বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। সেই স্থান দখল করেছেন প্রথমে ইয়েটস ও এলিয়ট, পরবর্তীকালে ম্যালার্মে, রিলকে, লোরকা। এর মাঝে পাবলো নেরুদা থেকে মাহমুদ দারবিশ, কমবিস্তর সবার কবিতাই ঢুকে পড়েছে পড়ার খাতায়।
পোএর কবিতা পড়তে গিয়ে বহুদিন বাদে শেলি আবার আমার কাছে ফিরে এলেন। বেঁচেছিলেন পো এর থেকে বছর দশেক কম। শেলি তিরিশে মারা যান, পো চল্লিশ। একইসময়ে থেকেছেন দুজনে। শেলির কবিতা তাকে কিভাবে অনুপ্রাণিত করেছে, বিভিন্ন জায়াগায় যা পরে লিখে যাবেন পো। আর লিখে যাবেন The Raven, শেলির To a skylark লেখারও বছরকুড়ি পর।
পো এর অন্যতম কবিতা The raven। বহুবিখ্যাত। আমার প্রিয়তমও বটে।
পো'র Ravenএ দাঁড়কাকের মুখ দিয়ে উচ্চারিত মৃত্যু, তা তার প্রিয়তমারও না, লেখকের নিজেরও না। কারণ মারা যাওয়া প্রেমিকার সাথে মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় করা প্রশ্নের উত্তরে আসা "Nevermore", এই শব্দ কোন পার্থিব মৃত্যু নয়, আসলে 'fatality of passion' এর কথা বলে। যে প্রসঙ্গে পরবর্তীকালে The poetic principleএ পো অপার্থিব সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের প্রশংসার ব্যাপারে বলতে গিয়ে বলবেন, " In regard to Passion, alas! its tendency is to degrade, rather than to elevate the Soul."
এই জায়গায়তেই পোএর Raven ও শেলির Skylark এক হয়ে যায়। শেলির স্কাইলার্ক, যে উপরে উঠে যাচ্ছে ক্রমশ সবকিছুকে তুচ্ছ করে। জাগতিক চেতনার বাইরে তার রূপ, পার্থিবতাকে অগ্রাহ্য করছে সে। পাশাপাশি পোএর Raven, যার 'Nevermore' তাকে করে তুলছে বিদেহি আত্মার স্বরূপ। এবং এখান থেকেই শেলি আর পো এবং তাদের পাখিরা আর বক্তা এবং ঘোষক নন, তারা লেখকেরই স্ব স্ব স্বত্বা হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছেন। এই দ্বৈততা তাদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসছে পো উল্লিখিত সেই জায়গাতেই, যাতে বিশ্বাস করে এসেছেন শেলি সারাজীবন। "Fatality of passion"।
এই লেখা লেখার চারবছর পরেই মারা যাবেন পো, তার সাধের জার্নালের প্রকাশিত হওয়ার আগেই। তার তৈরি করা গথিক ফিকশন পরবর্তীকালে পৃথিবীর বুকে ইতিহাস হয়ে যাবে ক্রমশ। আর তার মৃত্যুর আরও পঞ্চাশ বছর পর বরিশালে জন্ম নেবেন এক বাঙালি কবি। জীবনানন্দ দাশ।
"রয়েছে অনেক কাক এ উঠানে - তবু সেই ক্লান্ত দাঁড়কাক
নাই আর; অনেক বছর আগে আমে জামে হৃস্ট এক ঝাঁক
দাঁড়কাক দেখা যেত দিনরাত সে আমার ছোট বেলাকার
কবেকার কথা সব; আসিবে না পৃথিবীতে সেদিন আবার;
রাত না ফুরাতে সে যে কদমের ডাল থেকে দিয়ে যেত ডাক;"
এবং
"কবেকার মৃতকাক; পৃথিবীর পথে আজ নাই সেতো আর
তবুও সে ম্লান জানালার পাশে উড়ে আসে নীরব সোহাগে
মলিন পাখনা তার খড়ের চালের হিম শিশিরে মাথায়;
তখন এ পৃথিবীতে কোন পাখি জেগে এসে বসেনি শাখায়
পৃথিবীও নাই আর; দাঁড়কাক একা একা সারারাত জাগে
কি বা হায় আসে যায়, তারে যদি কোন দিন না পাই আবার"
এই যে গভীর মৃত্যুচেতনা, যা মিশে যাচ্ছে প্রকৃতির সাথে, তাতে দাঁড়কাকের হারিয়ে যাওয়াকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছেন জীবনানন্দ। যা নীরবে লেখকের মৃত্যুচেতনাকে তুলে ধরছে বারবার।
এভাবেই দুই পাখি, skylark ও Raven এর মধ্যে দিয়ে দুই শতাব্দির এপারে ওপারে জুড়ে থাকেন তিন কবি। জুড়ে থাকে দুই ভাষা। পোএর ম্যাকাবেরে থেকে জীবনানন্দের মৃত্যুচেতনা। আর হ্যাঁ, কবিতা।
আমেরিকার রোগশয্যা থেকে কলকাতার ট্রাম, যার যাত্রা কেবলই একাকিত্ব ও নির্জনতার।

Comments
Post a Comment